ArabicBengaliEnglishHindi

সুশিক্ষা ও আত্মসচেতনতা


প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ১৯, ২০২২, ৯:৫৭ অপরাহ্ন / ২৩৭
সুশিক্ষা ও আত্মসচেতনতা

আবু জাফর বিশ্বাস->>

একটি দেশ ও জাতির উন্নতি, অগ্রগতি, সমৃদ্ধির জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই। “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”। যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। তাই ‘নেলসন ম্যান্ডেলা’ বলেছেন- “শিক্ষা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, যার মধ্য দিয়ে পৃথিবীকে বদলে ফেলা যায়”। ‘নেপোলিয়ন’ বলেছেন- “তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেবো”। একটি শিশুর শিক্ষাগুরু প্রথমত তার পিতা-মাতা। আর সে আদবকায়দা ভদ্রতা শেখে পরিবার, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে। পিতা-মাতা আদর্শবান হলে সাধারণত সন্তানও চরিত্রবান, সুনাগরিক ও দেশপ্রেমিক হয়ে থাকে। তাই জাতিকে শিক্ষিত হতে হবে। তবে আমি মনে করি শুধুই উচ্চ শিক্ষা নয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা তাঁদের কর্মগুণে পুরো পৃথিবীটাকেই বদলে দিয়েছিলেন তাদের অনেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, কিংবা তাদের কোনো বড়-বড় ডিগ্রিও ছিল না। কিন্তু তাদের বিবেক মনুষ্যত্ব মূল্যবোধের শিক্ষা তাদেরকে এক সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থানে পৌছে দিয়েছে। ‘বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম’ অর্থের অভাবে লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি। এমন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ভারতীয় অভিনেতা ‘রজনীকান্ত’। পৃথিবী বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ‘জেমস ক্যামেরুন’। এ পি জে আব্দুল কালাম বলেছেন- “সূর্যের মতো দীপ্তিমান হতে হলে প্রথমে তোমাকে সূর্যের মতোই পুড়তে হবে”। তাই আমাদেরকে সাফল্যের লক্ষে সততার সাথে পরিশ্রম করে যেতে হবে। সুশিক্ষিত ব্যক্তির আচরণ নম্র ও ভদ্র হয়। তাঁর মধ্যে সততা, উদারতা, সহিষ্ণুতা, মানবতা এবং তাঁরা ধৈর্যশীলতার অধিকারী ও খোদাভীরু হয়ে থাকেন, যা সকলের কাছে সম্মানের। তাই বলতে চাই শুধুমাত্র শিক্ষা নয়, সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।
বিশ্বের এমন মহান ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের নাম উল্লেখ না করলেই নয়, যেমন- ‘নেলসন ম্যান্ডেলা’, ‘মহাত্মা গান্ধী’, ‘শেখ মুজিবুর রহমান’। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলে তার মধ্যে আত্ম সচেতনতাবোধ জন্ম নেয়। এজন্য সুশিক্ষা ও আত্ম সচেতনতার গুরুত্ব অপরিসীম এবং জাতি সচেতনতার একমাত্র অস্ত্র।

আত্ম সচেতনতা- কবি ‘গোলাম মোস্তফা’ তাঁর কিশোর কবিতায় দুটি লাইনে বলেছেন-
“ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে,
ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে”।
প্রত্যেক শিশুর ভিতরে যেমন একটি শিশু সত্ত্বা থাকে; আমাদের বড়দের ভিতরেও সুপ্ত প্রতিভা ও একটি শিশু সত্ত্বা আছে। সমস্ত আবেগ অনুভূতির মূলে রয়েছে এই শিশু সত্ত্বা। তাই বলতে চাই আমাদের ভিতরের সেই শিশুটিকেই জাগ্রত করে আত্ম সচেতনতাবোধ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ নিজে সচেতন না হলে সমাজ ও জাতিকে সচেতন করা সম্ভব না। আর সামাজিক সচেতনতাবোধ গড়ে তুলতে না পারলে দেশের শান্তি ও উন্নতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই আমি মনে করি আত্ম সচেতনতার গুরুত্ব অপরিহার্য। আমরা সুন্দরের প্রত্যাশায় স্বপ্ন দেখব, স্বপ্ন সৃষ্টি করব, স্বপ্ন পূরণে সৃষ্টির আনন্দ উপলব্ধি করব। ‘এ পি জে আব্দুল কালাম’ বলেছেন- “স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে; স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরনের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না”। মনে রাখতে হবে আমরা যেমন কোনো গুণীজনের অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ উৎসাহিত হই; তেমনি আমাদেরকেও ভালো কাজে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে হবে।
সামাজিক সচেতনতা- সমাজের যাবতীয় অন্যায় অত্যাচার, ব্যাভিচার, কুসংস্কার, বাল্য বিবাহ, যাবতীয় অসামাজিক কাজ থেকে সমাজকে সচেতন করা। শিশু ধর্ষণ, গৃহকর্মি কাজের বুয়ার প্রতি অশ্লীল আচরণ, এসব বিষয়ে হুঁশিয়ার থাকার পরামর্শ দেয়া। নারী নির্যাতন, নারী অধিকার এবং অধিকার সংশ্লিষ্ট আইন ও সমাজের হিংসাত্মক কার্যক্রম রোধ, আইনের শাসন প্রভৃতি বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা। মহামারী করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯), এখন ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট’ ও ‘ওমিক্রন’ নামে আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এছাড়া ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ বিষয়ে অবগত এবং কোনো গুজবে কান না দেয়ার জন্য চেতনাবোধ জাগ্রত করতে হবে। করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে করোনা মোকাবেলায় কঠিন পদক্ষেপ নেয়া, করণীয় সব কাজগুলো করা, যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মুখে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা, এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, এমন সব বিষয়ে অবশ্যই সচেতনতা বোধ সৃষ্টি করতে হবে। আর এসব কিছুর জন্য এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হুমকির মুখে পড়ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। নামছে ভূগর্ভস্থ পানির লেয়ার, বাড়ছে তাপমাত্রা, গলছে বরফ, সৃষ্টি হচ্ছে বন্যার। ভাঙছে নদীর পাড়, কমছে আবাদী জমির পরিমাণ। গ্রিনহাউজ ইফেক্ট, কল-কারখানা ও ইটের ভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, পলিথিন ব্যাগ, ভূমি দুষণ, শব্দ দুষণ, বর্জ্য নিষ্কাশনে অব্যবস্থাপনা, মাত্রাতিরিক্ত বৃক্ষনিধনের ফলে দুষিত হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। এসব হুমকির মুখ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে। এর জন্য তৈরি করতে হবে সামাজিক সচেতনতা। আর এই চেতনাবোধ তৈরি করতে হলে সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেকের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে, তাহলেই সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব। আর এসব কিছুর মূলে দরকার আমাদের ইচ্ছাশক্তি। তাই বলা হয় ইচ্ছাশক্তিই সাফল্যের চাবিকাঠি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রূপ-বৈচিত্রময় এই বিশ্ব, বন-বনানী, সবুজ-সজীবতা, শান্ত প্রকৃতি, নির্মল সুন্দর পরিবেশ সবকিছু যে স্বাভাবিক ভাবে চলছে; এ সবই মহান স্রষ্টা আল্লাহরই দান ও কৃপায়। প্রকৃতি কখনো ভয়ংকরও হয়ে থাকে, চরম বিপর্যয় নেমে আসে! এক মুহুর্তেই সবকিছু নিঃশেষ করে দেয়! আমাদের কিছুই করার থাকে না! কোনো জাতি-গোষ্টি যখন স্রষ্টাকে ভুলে ধর্মের প্রতি আঘাত, অন্যায়, অত্যাচার, অসভ্যতা, অশ্লিলতা, বরবরতা বেড়ে গিয়ে নৃশংস হিংস্র পশুর মত হয়ে গেছে, ঠিক তখনি তারা ধ্বংস হয়ে গেছে। যাকে বলে প্রকৃতির প্রতিশোধ! ইতিহাসে এমন নজির অনেক আছে। বর্তমান নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-২০১৯), এমন অগেও কয়টি ভাইরাস ছিল, যা মহামারী ও গজব হিসাবে আমাদের উপর বর্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া দাবানল, আগ্নেয়গিরি ও সুনামির কথা আমরা সবাই নিশ্চয় জানি।
সব শেষে বলতে চাই-
সৃষ্টিকর্তাকে আমরা আল্লাহ্, খোদা, ঈশ্বর, ভগবান, যেভাবেই ডাকি না কেনো; অন্তরে ভয় ও বিশ্বাস রাখতে হবে। পথভ্রষ্ট হওয়া যাবে না। সব ধর্মই শান্তির পথ দেখায়, মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। আমাদের উচিত সমস্ত আচার-আচারণ, কর্ম-কান্ড, সৃষ্টি সব যেন মানুষের কল্যাণে আসে, মানুষ উপকৃত হয়। আমাদের সৃজনশীল লেখনীর মাধ্যমে যেন তুলে ধরতে পারি সমাজের ক্ষত, দুঃখ-দুর্দশা, সমস্যা ও সম্ভাবনা। আমরা যেমন ইতিহাসের মহান ব্যক্তিদের ব্যক্তি চরিত্র ও গুণাবলী অনুস্মরণ ও অনুকরণ করি; আমাদের জীবনাদর্শও অনুস্মরণ অনুকরণ করে সবাই যেন খোদাভীরু দেশপ্রেম ও সুনাগরিক হতে পারে, তা থেকে আগামী প্রজন্ম যেন ভালো কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, এটাই আমার প্রত্যাশা। আমাদের সবার আত্ম সচেতনতা বোধ জাগ্রত হোক ও সকল বিপর্যয় কাটিয়ে সম্ভাবনাময় আগামীর পথচলা শুভ হোক। আল্লাহ্ হাফেজ।